Who Is Sheikh Tonmoy? Biography, Political Career and Bagerhat Connection
VSWFe17dZb4yVEzN1718gA
একটি দেশ, একটি স্বপ্ন এবং রূপান্তরের দুই দশকের গল্প
১৯৭১ সালে যে দেশটির জন্ম হয়েছিল অগ্নিস্নানের মধ্য দিয়ে, সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে যে নেতৃত্বের হাত সবচেয়ে বেশি, তাঁর নাম শেখ হাসিনা — বঙ্গবন্ধুকন্যা, বহুবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক।
স্বাধীনতার পরের দশকগুলোতে বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা একটি দেশ। বিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশকে "তলাবিহীন ঝুড়ি" বলে বিদ্রুপ করেছিল, তখন এই দেশের মানুষ সেই গঞ্জনা হজম করে টিকে থেকেছে, লড়েছে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিক শাসনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চেহারা আমূল বদলে যায়।
এই নিবন্ধে আমরা দেখব সেই পরিবর্তনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা — অর্থনীতি, অবকাঠামো, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সামাজিক উন্নয়ন। লক্ষ্য একটাই: তথ্যের আলোয় বুঝতে চাওয়া, আজকের বাংলাদেশ কতটা পাল্টেছে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৭৬৮ মার্কিন ডলারের আশেপাশে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৮০০ ডলারের উপরে। এটি শুধু সংখ্যা নয় — এর পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবনমানে বাস্তব পরিবর্তনের গল্প।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রতিবেদন
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়, এবং ২০২৬ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার পথে রয়েছে — যা দেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এই অগ্রগতির পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত: রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের প্রসার, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক উদ্যোক্তাদের সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং রেমিট্যান্সকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় সংযুক্ত করা।
শেখ হাসিনার শাসনামলের সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জন হলো দেশের অবকাঠামোতে আমূল পরিবর্তন। বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে যেগুলো শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং কৃতিত্ব নয়, বরং বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা।
২০২২ সালের জুনে উদ্বোধন হওয়া পদ্মাসেতু শুধু একটি সেতু নয়। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অর্থায়ন প্রত্যাহার করার পর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ৩০,১৯৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প সম্পন্ন করে। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ৩ কোটিরও বেশি মানুষকে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে পদ্মাসেতু দেশের জিডিপিতে বার্ষিক ১.২-১.৫% অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি যোগ করতে পারে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন হওয়া ঢাকা মেট্রোরেল দেশের গণপরিবহনের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক ঢাকার যানজটে ভোগান্তি কমাচ্ছে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেও ভূমিকা রাখছে। মেট্রোরেল প্রতিদিন লক্ষাধিক যাত্রী পরিবহন করে একটি আধুনিক নগরের চেহারা তৈরি করছে।
২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশ তার প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে পাঠায়। ৫৭টি দেশের এলিট ক্লাবে যোগ দেওয়ার এই মুহূর্ত ছিল বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি দেশের টেলিযোগাযোগ, সম্প্রচার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরাসরি কাজে আসছে।
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে যোগ হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। এটি বাংলাদেশকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায় স্থান দেবে — যা মাত্র কয়েক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল।
এর বাইরেও কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, এবং সারা দেশে শত শত কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণ বাংলাদেশের অবকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে "ডিজিটাল বাংলাদেশ" শব্দটি অনেকের কাছে স্লোগান মনে হয়েছিল। কিন্তু দেড় দশকের বাস্তবায়নে এটি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল মাত্র ৫৫ লাখের কাছাকাছি। ২০২৩-২৪ সাল নাগাদ সেই সংখ্যা ১২ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি সেবা পৌঁছে গেছে, যেখানে আগে মানুষকে জেলা শহরে বারবার ধরনা দিতে হতো।
ই-গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। জন্ম নিবন্ধন থেকে পাসপোর্ট, ভূমি রেকর্ড থেকে কর পরিশোধ — অনেক সেবাই এখন অনলাইনে পাওয়া সম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশগুলোর একটি এবং তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।
প্রতি বছর জানুয়ারির প্রথম দিনে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ এখন একটি জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সাল নাগাদ প্রায় ৩৫ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে — এই সংখ্যাটাই বলে দেয় শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের মাত্রা কোথায় পৌঁছেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৮% ছুঁয়েছে। নারী শিক্ষায় উপবৃত্তি কার্যক্রম মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
সারা দেশে ১৮,০০০-এরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় সত্যিকারের বিপ্লব এনেছে। এক সময় যে মা কোনো প্রসবপূর্ব সেবা পেতেন না, আজ তিনি গ্রামেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকা এবং পরামর্শ পাচ্ছেন। শিশুমৃত্যু হার এবং মাতৃমৃত্যু হার উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের এমন কয়েকটি দেশের একটি যেখানে একজন নারী দীর্ঘসময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এই নেতৃত্ব কেবল প্রতীকী নয় — সংসদে নারীর আসন সংরক্ষণ, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা, এবং তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ স্থানে রয়েছে।
অর্জনের এই তালিকা যতটা দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি — সমুদ্রস্তর উচ্চতা, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং বন্যার বাড়তি প্রকোপ দেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সরকার জলবায়ু সহনশীলতার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবিতে সোচ্চার থেকেছে।
আয় বৈষম্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সার্বিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও এর সুফল সমানভাবে বিতরিত হয়নি। নগর-গ্রাম বিভাজন, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় সরকার "স্মার্ট বাংলাদেশ" ভিশন ঘোষণা করেছে — ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, স্মার্ট এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে। চারটি মূল স্তম্ভ হলো স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট সমাজ।
বাংলাদেশের গল্পটা আসলে একটা পুনর্জন্মের গল্প। যে দেশকে একসময় ব্যর্থ রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে টানা হতো, সেই দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উঠে আসছে। পদ্মার পাড়ে দাঁড়ানো সেতু, মাটির নিচ দিয়ে ছুটে যাওয়া মেট্রো, এবং মহাকাশে ভাসমান স্যাটেলাইট — এগুলো শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং কৃতিত্ব নয়, এগুলো একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের নতুন সংজ্ঞা।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক যাত্রা বিতর্কহীন নয়, এবং সুশাসনের প্রশ্নে সমালোচনা আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক রূপান্তরের নিরিখে তাঁর নেতৃত্বকালকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নির্ধারক অধ্যায় বলা যায়। "স্বপ্নের রূপকার" উপাধিটি কেবল প্রশংসার শব্দ নয় — এটি একটি বাস্তব কাজের বিবরণ, যা সংখ্যায়, ইট-পাথরে এবং কোটি মানুষের জীবনমানে লেখা আছে।
২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনো চলমান। কিন্তু এ পর্যন্ত যা অর্জিত হয়েছে, তা দেখে বলা যায় — এই দেশ তার গন্তব্য চেনে এবং পথ চলতে জানে।
এই নিবন্ধটি সম্পর্কে আপনার মতামত জানান।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা নিয়ে আরও বিশ্লেষণ পেতে ভিজিট করুন: durbarbagerhat.blogspot.com
এই নিবন্ধটি পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং নিচে মন্তব্যে আপনার ভাবনা লিখুন।
Comments
Post a Comment
Welcome to 'Durbar Bagerhat'. Please leave constructive and polite comments here. Spam links or offensive comments will not be published.